Namishyarany Part-1
Madhumita Bhattacharjee
0:00 / 0:00
Namishyarany Part-1
12 просмотров · 2 недели назад
Madhumita Bhattacharjee
37 подписчиков
12 просмотров · 2 недели назад
নৈমিষারণ্য (১)
লক্ষ্ণৌ থেকে নৈমিষারণ্য যাবার রাস্তাটি বেশ সুন্দর, সবুজে ঘেরা- যদিও আমরা উত্তর পূর্বাঞ্চলের মানুষেরা এমন সবুজ দেখেই অভ্যস্থ,তবু ভালই লাগছিল। আমাদের পাইলট বাবু বললেন মোটামুটি ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট লাগবে গন্তব্যে পৌঁছুতে। তাহলে এই সময়টুকু কে কাজে লাগিয়ে নৈমিষারণ্য কে একটু জেনেনি। গোমতী নদীর তীরে অতি প্রাচীন তীর্থ এই নৈমিষারণ্য। রামায়ন, মহাভারত,পুরান সর্বত্রই নৈমিষারণ্যের উল্লেখ আছে।
নৈমিষ মানে নিমেষে বা এক পলকে আর অরন্য হলো বন।প্রাচীন কালে এই ঘন জঙ্গলে অনেক মুনি ঋষিরা সাধনা করতেন । কিন্তু তাদের অনবরত উত্যক্ত করে চলতো অসুরেরা। তাই তারা বাধ্য হয়ে দেবতার শরণ নিলে বিষ্ণু এক নিমেষে সেই অসুরদের নিধন করেন। আবার কারো মতে অসুরের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলে তিনি একটি চক্র নিক্ষেপ করে বলেন এই চক্র যেখানে পড়বে সেই পরিধির মধ্যে হবে সাধু সন্তদের তপোভূমি। চক্র এসে পড়ে এই অরন্যে। নেমি মানে চক্রের পরিধি তাই নেমিশারন্য।তার থেকে বিবর্তনে নৈমিষারণ্য ।এখানে ভগবান অরন্য রূপে বিরাজমান এমন বিশ্বাস করা হয়। প্রকৃতিকে বাঁচানোর কতো প্রচেষ্টা যুগ যুগ ধরে চলছে।
আবার পুরাণ কাহিনীতে শোনা যায়, গৌরমুখ মুনি নাকি এখানে এক নিমেষে দুর্জয়-দানবের সৈন্য-সামন্ত পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিলেন– দুর্জয়ের সেই ভস্মপীঠের ওপরেই গজিয়ে উঠল ঘন বন, যার নাম নৈমিষারণ্য।
কথিত যে মনু এবং শতরূপা ভগবান কে পুত্ররূপে পাওয়ার জন্যে এখানে তপস্যা করেছিলেন। চার বেদ, ছয় শাস্ত্র ,১৮ পুরাণ বেদব্যাস এখানে লিখেছিলেন। ঋষি দধিচী এখানে তার দেহ দান করে ছিলেন। কুলপতি মহর্ষি শৌনক নৈমিশারণ্যে দ্বাদশ বার্ষিক যজ্ঞ করেছিলেন। ভারত ভ্রমণকালে মহাপ্রভু চৈতন্যদেব নৈমিষারণ্যে গিয়েছিলেন। এরপর এখানে গৌড়ীয় মঠ প্রতিষ্ঠিত হয়। সন্দীপনি মুনি, গর্গমুনি,পরশুরাম, কাশ্যপ ইত্যাদি অষ্টআশি হাজার ঋষির পাদস্পর্শে পুণ্য এই তপোভূমি।।
এবার আমি আমার মত করে বুঝে নেবার চেষ্টা করলাম। আমাদের বেদ,শাস্ত্র ইত্যাদি প্রণয়ন করতে বহু শত বছর ধরে পণ্ডিতদের(প্রাচীন মুনি, ঋষিদের)অনেক অধ্যয়নের (research) প্রয়োজন হয়েছিল। তার জন্যে তাঁরা একটি নির্জন শান্ত জায়গা খুঁজে নিয়েছিলেন যেখানে শান্তিতে অধ্যয়ন এবং অধ্যাপনা করা যাবে কিন্তু অসুর বা দানব অর্থাৎ Anti social elements জমির দখলদারি নিতে বা তাদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে মুনি ঋষিদের অনবরত উত্যক্ত করতো তখন হয়তো এক বা একাধিক শক্তিশালী শাসক ওই দুষ্কৃতিকারীদের বিদেয় করে নৈমিষারণ্য কে ঋষিদের নির্বিঘ্নে সাধনার (অধ্যয়নের) স্থানে পরিণত করেন। তাই প্রাচীন কাল থেকে নৈমিষারণ্য তপোভূমি ধার্মিক চেতনা জাগরণের কেন্দ্রভূমি (ইউনিভার্সিটি) ছিল। তপোস্থল মানে আজকের ভাষায় বৈদিক শহর।
এইসব আলোচনা করতে করতে দেখি কখন ললিতা দেবীর মন্দির এসে গেল। অনেক পুরনো মন্দির । প্রচুর ভক্ত সমাগম হছছে। অনেকের মতে এইটা শক্তিপীঠ। আসলে আমাদের সব সহায় সম্বল মা। তাই মা কে আমরা শক্তিধারিনী রূপেই দেখতে চাই তাহলে মা আমাদের সব অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা করতে পারবেন। মন্দিরের লাগোয়া কাল ভৈরব, হনুমান মন্দির দেখে আমরা দর্শন করতে গেলাম এই মন্দিরের উল্টো দিকে কালীপিঠ মন্দিরে। হোটেলের মতো একটা বিল্ডিং নিচের তলায় মন্দির। ভিতরে কালী প্রতিমা,দশ মহাবিদ্যা এবং ৫১পীঠের প্রতীক রাখা আছে। ঘুরে ফিরে বুঝলাম এখানে যাগযজ্ঞ,কথা প্রবচন ইত্যাদি সব সময় অনুষ্ঠিত হয়। উপরের তলায় সম্ভবত বৈদিক শাস্ত্র চর্চা হয়। খুব জাগ্রত মন্দির হিসেবে বিখ্যাত।
পাইলট মেঘ সিং বাবু এবার আমাদের চক্রতীর্থে নিয়ে আসলেন। উপাখ্যান অনুসারে ব্রহ্মার চক্র এখানে এসে পাতাল ভেদ করে প্লাবন সৃষ্টি করলে শক্তিরূপা মা ললিতা প্লাবনকে চক্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেন। জলকুণ্ডের মাঝে কেউ যেতে পারে না ওখানে নাকি অতল জল সব তলিয়ে যায়। সবাই চক্রের চারপাশে কোমর জলে স্নান করছে। তবে ভাল করে কিছু দেখবার আগেই দেখি আমাদের দু জনের দু পাশে মন্ত্র উচ্চারিত হচ্ছে আর আমরা যে কখন অর্ঘ্য পুজা সব করে ফেললাম নিজেরাই ভাল করে বুঝলাম না। যাক এবার নিশ্চিন্ত হয়ে চক্রের পাশে ভুতেশ্বর মহাদেব, বালাজী, বিষ্ণু মন্দির দর্শন করে ব্যাসদেবের গদি দেখতে চললাম। যেতে যেতে ভাবছি ব্রহ্মার চক্রটিকে মনরূপ চক্র বলা হয়। আসলে চক্রটি আমাদের জীবন চক্রের প্রতীক। জন্ম মৃত্যু সুখ দুঃখ সব নিয়ে আমরা চক্রাকারে ঘুরছি। চক্রের বাইরের কোমর জল ভোগ বাসনার প্রতীক। ভোগ বাসনা পরিমিত হলে নিরাপদে জীবন চক্র চলতে থাকে। কিন্তু অপরিসীম ভোগ বাসনা এই চক্রের গভীর জলের মতো একেবারে পাতালে টেনে নিয়ে যায়।
দূর থেকে ব্যাসগদী দেখে একটু হতাশ হলাম। অনেক মন্দির এক সাথে থাকায় জায়গাটাকে মফঃস্বলের shopping complex লাগছে। এখানে দেখলাম অনেক মন্দির বাড়ি বা গ্যালারীর মতো। মন্দির মনে হয় না। আমার কল্পনার সাথে মিলল না। পৌরাণিক কথা অনুযায়ী এখানে শৌনকমুনি বারো বছর যজ্ঞ করেছিলেন যেখানে ৮৮ হাজার মুনি ঋষিরা এসেছিলেন ,ব্যাসদেব এখানে বসে বেদ পুরাণ লিখেছেন । তাই সবার নামে মন্দির আছে। বিশাল বড় অক্ষয় বট গাছ পুরো জায়গাটাকে ঢেকে রেখেছে। তবে দেখে ভালো লাগলো গাছকে ভিতরে রেখে মন্দিরগুলি বানানো হচ্ছে। এইভাবে ভগবান যেন এখানে সব সময় অরন্য রূপে বিরাজ করেন।
এবার নাকি যাবো পৃথিবীর একমাত্র মন্দির যেখানে চার বেদ রাখা আছে “পুরাণ মন্দির”। অবশ্য ভারতবর্ষ ছাড়া বেদের মন্দির আর কোথায়ই বা হবে। তবে এখানে আর একটু সময় থেকে তারপর যাব ।