চোখের বালি উপন্যাস (অনার্স প্রথম ও মাস্টার্স শেষ বর্ষ)। ব্যাখ্যা মূলক আলোচনা।
সাহিত্য খেলা
0:00 / 0:00
চোখের বালি উপন্যাস (অনার্স প্রথম ও মাস্টার্স শেষ বর্ষ)। ব্যাখ্যা মূলক আলোচনা।
19 134 просмотра · 2 года назад
সাহিত্য খেলা
22,4 тыс. подписчиков
19 134 просмотра · 2 года назад
‘চোখের বালি’ (১৯০৩) প্রকাশের পর সাহিত্য মহলে রবীন্দ্রনাথ যেন নবরূপে আবির্ভূত হলেন। সমঝদার পাঠকের কাছে এই উপন্যাস ব্যতিক্রমী বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছে। উপন্যাসের আখ্যানভাগ, চরিত্র নির্মাণকৌশল, চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন, গদ্যভাষার সৌকর্য, সামাজিক প্রেক্ষাপট ও লেখকের ব্যক্তিগত জীবনদর্শনের অসামান্য রূপায়ণ ‘চোখের বালি’-কে ধ্রুপদি উপন্যাসের মর্যাদা দিয়েছে। এই উপন্যাসের বিস্তৃত পটভূমিতে লেখক প্রেমকে উপজীব্য করে তুলে এনেছেন ব্যক্তি, ধর্ম ও সমাজের অভ্যন্তরীণ ক্ষত। ত্রিভুজ প্রেমের জটিল আবর্তে পড়ে মহেন্দ্র, বিনোদিনী, আশালতা ও বিহারী বিপর্যস্ত হয়েছে। পাঠক এই বিপর্যস্ত চরিত্রের মাধ্যমে আধুনিক মানুষের যন্ত্রণায় জর্জরিত জীবনের খোঁজ পাবেন। যদিও ইতোপূর্বে লেখকের ‘করুণা’ (১৮৭৭-১৮৭৮), ‘বৌঠাকুরাণীর হাট’ (১৮৮৩) ও ‘রাজর্ষি’ (১৮৮৭) উপন্যাস প্রকাশ পেয়েছে। তবে বিষয় ও আঙ্গিক বিবেচনায় ‘চোখের বালি’ পাঠকের বেশি মনোযোগ পেয়েছে। ‘করুণা’ লেখকের ১৬-১৭ বছর বয়সে লেখা প্রথম উপন্যাস। ‘ভারতী’ পত্রিকা ছাড়া এটি জীবদ্দশায় গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায়নি। এ ছাড়া আঙ্গিক বিচারে তেমন প্রভাববিস্তারিও নয়। অন্যদিকে ‘বৌঠাকুরাণীর হাট’ ও ‘রাজর্ষি’ দুটিই ঐতিহাসিক উপন্যাস। ফলে বিষয় ও বিন্যাসে ‘চোখের বালি’ অনন্য।
‘চোখের বালি’ প্রথম (১৯০১-১৯০২) ‘নবপর্যায় বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। সম্পাদক শ্রীশচন্দ্র ধারাবাহিক লেখার আমন্ত্রণ জানালে রবীন্দ্রনাথ এ ব্যাপারে নিরুৎসাহিত বোধ করেন। কারণ একদিন এই ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাস প্রকাশ পেয়েছিল। পাঠক সেই উপন্যাসের রস আস্বাদন করেছেন। বইয়ের সূচনায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন: ‘আমরা একদা বঙ্গদর্শনে বিষবৃক্ষ উপন্যাসের রস সম্ভোগ করেছি। তখনকার দিনে সে রস ছিল নতুন। পরে সেই বঙ্গদর্শনকে নবপর্যায়ে টেনে আনা যেতে পারে কিন্তু সেই প্রথম পালার পুনরাবৃত্তি হতে পারে না। সেদিনের আসর ভেঙে গেছে, নতুন সম্পাদককে রাস্তার মোড় ফেরাতেই হবে। সহ-সম্পাদক শৈলেশের বিশ্বাস ছিল, আমি এই মাসিকের বর্ষব্যাপী ভোজে গল্পের পুরো পরিমাণ জোগান দিতে পারি। অতএব কোমর বাঁধতে হবে আমাকে। ... তাই গল্পের আবদার যখন এড়াতে পারলুম না তখন নামতে হল মনের সংসারের সেই কারখানা-ঘরে যেখানে আগুনের জ্বলুনি হাতুড়ির পিটুনি থেকে দৃঢ় ধাতুর মূর্তি জেগে উঠতে থাকে। মানববিধাতার এই নির্মম সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার বিবরণ তার পূর্বে গল্প অবলম্বন করে বাংলা ভাষায় আর প্রকাশ পায় নি।’
এতদিন বাংলা উপন্যাস ছিল কাহিনিপ্রধান। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কাহিনিপ্রধান উপন্যাসের যে সরণি নির্মাণ করেছেন, রবীন্দ্রনাথ সে পথে হাঁটতে চাননি। তিনি বাংলা উপন্যাসের মোড় ফেরাতে ব্যক্তি চরিত্রের মনোভূমির ওপর নজর দিয়েছেন। ‘চোখের বালি’ যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। লক্ষ্য করার বিষয়, রবীন্দ্র উপন্যাসের নারী ও পুরুষ চরিত্রগুলো বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে নির্মিত হয়েছে। কোথাও কোথাও প্রচলিত সংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের মূলে তিনি আঘাত করেছেন। ‘চোখের বালি’ উপন্যাসে সম্পর্কের চিরায়ত ধারণা ধসে পড়ে। মহেন্দ্র তার মা রাজলক্ষ্মীর অনুগত সন্তান হওয়া সত্ত্বেও একসময় মায়ের অবাধ্য হয়েছে।
মহেন্দ্র ও বিহারী দুই বাল্যবন্ধুর আন্তরিক সম্পর্কেও একসময় ফাটল ধরেছে। আশালতা ও বিনোদিনীর পারস্পরিক বন্ধুত্বও একসময় বৈরিতায় রূপ নেয়। অর্থাৎ পরিস্থিতির শিকার হয়ে উপন্যাসের চরিত্রগুলো বদলে যায়। তারা পরস্পর অন্তর্দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ও অন্তর্দ্বন্দ্ব উপন্যাসকে বিশিষ্ট করে তুলেছে। ‘চোখের বালি’র সূচনায় রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছেন: ‘আমার সাহিত্যের পথযাত্রা পূর্বাপর অনুসরণ করে দেখলে ধরা পড়বে যে ‘চোখের বালি’ উপন্যাসটা আকস্মিক, কেবল আমার মধ্যে নয়, সেদিনকার বাংলা সাহিত্যক্ষেত্রে। বাইরে থেকে কোন্ ইশারা এসেছিল আমার মনে, সে প্রশ্নটা দুরূহ।’
‘চোখের বালি’ বাংলা ভাষার প্রথম ‘মনস্তাত্ত্বিক সামাজিক’ উপন্যাস। শুরুর দিকে রবীন্দ্রনাথ ইতিহাসনির্ভর উপন্যাস লিখলেও ‘চোখের বালি’ উপন্যাসে চরিত্রের রহস্যময় মনোজগতে অবগাহন শুরু করেন। তিনি অনুভব করেন, মানুষের বাইরের জীবন মনোজগত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ফলে অবচেতন মনের নানা স্তর তাঁর সৃষ্ট চরিত্রকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মহেন্দ্র ও বিনোদিনী। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে আশালতা কিংবা বিহারীকেও গৌণ চরিত্র বলা যায় না। উপন্যাসের আদ্যন্ত চারটি চরিত্রই সক্রিয় ও দ্বন্দ্বমুখর থাকে। সংক্ষেপে উপন্যাসের আখ্যানভাগ এ রকম– সুন্দরী গুণবতী হিন্দু তরুণী বিনোদিনী। মহেন্দ্রের মা রাজলক্ষ্মী ছেলের জন্য এই বিনোদিনীকে পছন্দ করেছিলেন। কিন্তু ডাক্তার মহেন্দ্র বাবু এই বিয়েতে মত দেননি। ফলে বিনোদিনীর অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায়। ‘চোখের বালি’ উপন্যাসের বিনোদিনীকে কেউ কেউ বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক নারীর স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন। রূপে-গুণে, শিক্ষা-দীক্ষায় সে আশালতার চেয়ে অগ্রসর। উপন্যাসে মহেন্দ্র ও বিহারী নামে দুই পুরুষের সঙ্গে তার ভাব বিনিময়ের ধরন শৈল্পিক ও বুদ্ধিদীপ্ত। তার কথোপকথনে দার্শনিক জিজ্ঞাসার অবতারণা হয়। লেখকের ভাষায়: ‘বিনোদিনীর বাপ বিশেষ ধনী ছিল না, কিন্তু তাহার একমাত্র কন্যাকে সে মিশনারি মেম রাখিয়া বহু যত্নে পড়াশোনা ও কারুকার্য শিখাইয়াছিল।’ মহেন্দ্র বিনোদিনীর প্রেমের জালে সহজেই আটকে যায়। শুধু তাই নয়, তার সাহচর্য পেয়ে সহজ-সরল আশালতাও মুগ্ধ হয়। সে বিনোদিনীর সঙ্গে বন্ধুতা গড়ে তোলে। শুধু তাই নয়, বিনোদিনী তার নিজের নাম ঠিক করে দেয় ‘চোখের বালি’। এই নাম উপন্যাসের নামকরণে যথাযথ হয়েছে নিশ্চয়।
নারী-পুরুষের প্রেম ও কামতাড়িত অনুভব ‘চোখের বালি’ উপন্যাসের মূল সুর। উপন্যাসের কাহিনির ওপর ভর করে রবীন্দ্রনাথ চরিত্রের অন্তর্জগতের জটিল রহস্য উদ্ঘাটনে উৎসাহী হয়েছেন। বিধবা তরুণীর মনোবেদনা ও সামাজিক অবস্থান মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণের প্রয়াস রয়েছে।