-আপনি জানেন না, আপনাকে হারানোর কথা শুনলেই আমার বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায়। এতদিন আমি ভেবেছি
Amader Golpo
0:00 / 0:00
-আপনি জানেন না, আপনাকে হারানোর কথা শুনলেই আমার বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায়। এতদিন আমি ভেবেছি
2 001 просмотр · 15 часов назад
Amader Golpo
2,57 тыс. подписчиков
2 001 просмотр · 15 часов назад
-আপনি জানেন না, আপনাকে হারানোর কথা শুনলেই আমার বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায়। এতদিন আমি ভেবেছি আপনাকে দূরে রাখলেই ভালো। ভেবেছিলাম একা থাকাই আমার নিয়তি, একা লড়াই করাই আমার অহংকার। আজ বুঝতে পারছি, আপনাকে দূরে সরিয়ে রাখার ভয়টাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় ভয়। আমি নিজেকে বাঁচানোর অজুহাতে আসলে নিজের সুখকেই অস্বীকার করছিলাম। তাই আর এমন কথা বলবেন না, দোহাই আপনার।
শেহরিয়ার খুব আস্তে, ক্লান্ত অথচ গভীর গলায় বলল, -তুমি আমার চোখের সামনে থাকো। দূরে যেও না। -আমি আছি। আমি থাকব। কোথাও যাচ্ছি না আমি। পৃথিবীর কোনো শক্তি আমাকে আজ আপনার থেকে আলাদা করতে পারবে না।
কুহু এক হাত বাড়িয়ে অত্যন্ত যত্নে শেহরিয়ারের ঘামে ভেজা তপ্ত কপালের ওপর রাখল। কপালের ভাঁজগুলো যেন নরম হাতের স্পর্শ পেয়ে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে চাইল। -আপনি ঘুমান। আমি আপনার পাশেই আছি। আজ রাতটা না হয় আমার হোক। গোটা রাত আমি আপনাকে দেখে আমার চোখের তৃষ্ণা মেটাতে চাই। সারাজীবনের যত না-দেখা বাকি ছিল, সব আজ এই এক রাতে পূর্ণ করে নেব।
শেহরিয়ারের ঠোঁটের কোণে ম্লান হাসির রেখা ফুটে উঠল। চোখের কোণে জমে উঠল একবিন্দু জল। -সারারাত? -কেন, ভয় হচ্ছে? ভেবেছেন আপনার কুহুপাখি ঘুমিয়ে পড়বে আর আপনি একা জেগে থাকবেন? -না। শুধু মনে হচ্ছে, এতদিনের অপেক্ষাটা বুঝি সত্যিই সার্থক হলো। মনে হচ্ছে এই মুহূর্তটার জন্যই বিধাতা আমার এত কষ্টের জীবনটা সাজিয়েছিলেন।
কুহু ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। হুইলচেয়ারের চাকাটা আলতো করে ঘুরিয়ে বিছানার একদম কাছে নিয়ে এল। শেহরিয়ারের শরীর এখন ভারী পাথরের মতো অবশ। সে সাবধানে শেহরিয়ারের কাঁধের নিচে হাত দিল, শেহরিয়ারের দুর্বল বাহুটা কুহুর গলার ওপর জড়িয়ে গেল। সামান্য নড়াচড়াতেই মানুষটার দম আটকে আসছিল, বুকের ভেতর ওঠানামা করছিল ভারী শ্বাস। কুহু তাকে প্রতিটি পদক্ষেপে আগলে রেখে অত্যন্ত সাবধানে বিছানায় উঠতে সাহায্য করল। তার শরীরে এখনও প্রচণ্ড দুর্বলতা, একটু ভর পেলেই টলে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। কুহু খুব যত্ন করে তার ভারী চামড়ার জুতোজোড়া খুলে পায়ের দিকটায় সরিয়ে রাখল। গায়ের শার্টের ভাঁজ ঠিক করে দিয়ে, কলারের বোতামটা একটু আলগা করে দিল যাতে নিশ্বাস নিতে কষ্ট না হয়। তারপর তাকে আরাম করে বালিশে মাথা এলিয়ে শুইয়ে দিল।
শেহরিয়ার চোখ বন্ধ করল। কুহু নরম তুলোর মতো বালিশটা টেনে দিয়ে তার মাথার নিচে নিজের একখানা হাত পরম যত্নে রেখে দিল। -এবার চোখ বন্ধ করুন। অনেক রাত হয়েছে। -তুমি যাবে না তো? হঠাৎ চোখ খুলে যদি দেখি তুমি নেই? -না। কোথাও যাব না। এই তো, আপনার হাত ধরে বসে আছি। -প্রমিস? কুহু শেহরিয়ারের কপালে আলতো করে নিজের কপাল ঠেকিয়ে মৃদু হেসে বলল, -প্রমিস। আজীবন পাশে থাকার প্রমিস।
শেহরিয়ার এবার নিশ্চিন্ত হলো। এক দীর্ঘ, তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে চোখ দুটো পুরোপুরি বুজে ফেলল সে। কুহু তার চুলের ভেতর আঙুল ডুবিয়ে ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। মাথার তালু থেকে শুরু করে কপালের ওপর সেই ছন্দময় স্পর্শ শেহরিয়ারের দীর্ঘদিনের জমে থাকা স্নায়বিক যন্ত্রণা নিমিষে শুষে নিতে লাগল। ক্লান্ত শরীর অবশেষে যেন এক নিরাপদ আশ্রয়ের দেখা পেল, যেখানে কোনো রোগ নেই, যন্ত্রণা নেই, হারিয়ে যাওয়ার ভীতি নেই। কুহুর আঙুলের পরশে কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার শ্বাস-প্রশ্বাস শান্ত, ধীর আর ছন্দবদ্ধ হয়ে এলো। কুহু কিন্তু নিজের হাত থামাল না। তার ক্লান্ত হাতের সঞ্চালন চলতেই থাকল নিরন্তর ভালোবাসার দোলায়।
একসময় শেহরিয়ার গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। কুহু তখনও বিছানার পাশে মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে রইল। তার চোখ জোড়া একদৃষ্টিতে নিবদ্ধ রইল মানুষটার শান্ত মুখের দিকে। ঘুমের মধ্যেও শেহরিয়ারের মুখের অবয়বে এক অসহ্য যন্ত্রণার দাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। চোখের নিচে কালচে ছোপ, গালের হাড়গুলো কিছুটা ভেসে উঠেছে। অথচ সেই অপলক মুখটার দিকে তাকিয়েই কুহুর মনে হলো, এই নিঃস্ব, অসুস্থ মানুষটাকে সে কত অল্প সময়ে কত গভীরভাবে নিজের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছে! যাকে একদিন পর মনে হয়েছিল, যার উপস্থিতি একদিন বিরক্তির কারণ ছিল, আজ সে-ই তার সমগ্র সত্তার কেন্দ্রবিন্দু।
কুহুর মনের ভেতর অজান্তেই প্রশ্ন জেগে উঠল, -আমি এমন কী ভালো কাজ করেছিলাম যে, জীবনের এত বড় লটারি আমার ভাগ্যে জুটল?
কুহু নিজের মনেই মৃদু হাসল। সেই হাসির পেছনে লুকিয়ে ছিল এক সমুদ্র কৃতজ্ঞতা। -কীভাবে এত ভালোবাসা আমি পেলাম? এই ভাঙাচোরা, ক্ষতবিক্ষত আমায় কেন বিধাতা এমন অমূল্য এক উপহার দিয়ে ভরিয়ে দিলেন?
তার দৃষ্টি শেহরিয়ারের মুখ থেকে এক পলকের জন্যও সরল না। একটা মানুষ তাকে পাওয়ার জন্য কতটা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে! সমাজ, পরিবার, নিজের শরীর—সব প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়ে সে শুধু ভালোবেসে গেছে। তার জীবনের অন্ধকার অতীত জেনেও সে এক পা-ও পিছিয়ে যায়নি। অতীতের কোনো কালিমাই শেহরিয়ারের চোখে কুহুর পবিত্রতাকে ম্লান করতে পারেনি। কুহুর দীর্ঘদিনের ভয়, কুসংস্কার আর দ্বিধাকে শেহরিয়ার নিজের সীমাহীন ধৈর্য দিয়ে জয় করেছে। দিনের পর দিন কুহুর অভিমানী রূপ সহ্য করেছে, বুকভরা প্রত্যাখ্যানের