মনোসামাজিক সেবা ও এর গুরুত্ব
Auntorbarta - অন্তর্বার্তা
0:00 / 0:00
মনোসামাজিক সেবা ও এর গুরুত্ব
31 просмотр · 8 дн. назад
Auntorbarta - অন্তর্বার্তা
5 подписчиков
31 просмотр · 8 дн. назад
মনোসামাজিক সেবা ও এর গুরুত্ব
লেখকঃ প্রফেসর কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী,
চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
কোন একটি বিশেষ সংজ্ঞার মাধ্যমে মনোসামাজিক সেবা ধারণাটিকে ব্যাখ্যা করা কঠিন। মানুষের সামগ্রিক চাহিদা বিবেচনার প্রেক্ষিতে মনোসামাজিক শব্দটিকে বিভিন্ন ভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এখানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দুটো সংজ্ঞা প্রদান করা হলো-
মনোসামাজিক সেবা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একজন ব্যক্তির সর্বোচ্চ শক্তির পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হয় যাতে সে কমিউনিটিতে নিজ উদ্যোগে পুরোপুরি কর্মক্ষম হতে সক্ষম হয়। মনোসামাজিক সেবার প্রক্রিয়া এবং পদ্ধতি ব্যক্তির চাহিদা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন হয়। এক্ষেত্রে এই সেবা ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক যোগ্যতা অর্জনের জন্য ব্যক্তির স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে অনেক বেশী জোর দিয়ে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় মূলতঃ ব্যক্তির সামগ্রিকতা এবং ভাল থাকার উপর গুরুত্ব দেয়া হয় এবং ব্যক্তির বৃত্তিমূলক, সামাজিক / বিনোদনমূলক কর্মকান্ড, শিক্ষাগত এবং ব্যক্তিগত উপযোজনের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটি সামষ্টিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরীর চেষ্টা করা হয়। [International Association of Psychosocial Rehabilitation Service (IAPRS)] মনোসামাজিক সেবা হল এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে মানসিক বৈকল্যের ফলে সৃষ্ট সমস্যা, অক্ষমতা অথবা চরম প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিকে এমন একটি সুযোগ তৈরী করে দেয়া হয় যাতে করে ব্যক্তি তার সর্বোচ্চ ক্ষমতার বিকাশ সাধনের মাধ্যমে কমিউনিটি পর্যায়ে নিজেই পুরোপুরি কর্মক্ষম হতে পারে (World Health Organization)।
'মনোসামাজিক' শব্দটি বলতে মূলতঃ কতগুলি মানসিক এবং সামাজিক উপাদানের মধ্যে একটি গতিশীল সম্পর্ক বোঝায় যারা ক্রমাগত একে অন্যের উপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। 'মনো' বা মানসিক অংশটি নির্দেশ করে সেই সকল অংশগুলো যা কতগুলো মানসিক কার্যক্রম, যেমন: চিন্তা প্রক্রিয়া, আবেগ-অনুভূতি, প্রত্যক্ষণ, বুদ্ধি ইত্যাদি নির্দেশ করে। মূলতঃ এই উপাদানগুলোই একজন ব্যক্তির মানসিক অবস্থা, আচরণ ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে।
'সামাজিক' অংশটি নির্দেশ করে কতগুলো সামাজিক উপাদান যেমন পারস্পরিক সম্পর্ক, সামাজিক আচরণ ইত্যাদি। একজন ব্যক্তির সামাজিক দক্ষতা এবং সম্পর্ক স্থাপন ও পারস্পরিক যোগাযোগের যোগ্যতা ইত্যাদি এই সামাজিক উপাদান গুলির মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হয়।
উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে এটা বলা যায় যে 'মনোসামাজিক সেবা' হচ্ছে মূলতঃ মানসিক ও সামাজিক উপাদান গুলির সমন্বয়ে গঠিত একটি সেবামূলক ব্যবস্থা যার মাধ্যমে ব্যক্তির মানসিক ও সামাজিক গুণাবলীর পৃথক পৃথক ও সামগ্রিক উৎকর্ষতা সাধন করা হয় । 'মনোসামাজিক সেবা' শব্দটির সাথে শারীরিক অংশটি সংযুক্ত না থাকলেও ব্যক্তির মনোসামাজিক উন্নয়নের সাথে শারীরিক বিষয়গুলি ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। অন্য কথায় এটা বলা যায় যে, মনোসামাজিক উন্নয়ন এবং শারীরিক সক্ষমতা একে অন্যের পরিপূরক। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটির উৎকর্ষতা বৃদ্ধি সম্ভব নয়। একটি উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি বোঝানো যেতে পারে।
আমরা যদি একটি বাসাবাড়ীর কথা চিন্তা করি, তাহলে দেখতে পাব যে বাড়ীটির সুষ্ঠুভাবে আবাসযোগ্য হওয়ার জন্য বেশ কয়েকটি উপাদানের প্রয়োজন। যেমন, বাড়ীটির জন্য একটি জমির প্রয়োজন যার উপর তৈরী হবে বাড়ীর কাঠামো। এছাড়াও এই কাঠামো তৈরীর জন্য প্রয়োজন ইট, কাঠ, চাল, বাঁশ ইত্যাদি এবং এগুলোর সু ব্যবহার। স্বাভাবিকভাবে বাড়ী তৈরীর এই উপাদানগুলিকে আমরা শারীরিক উপাদানের সাথে তুলনা করতে পারি। একটি বাড়ীর শুধু কাঠামো থাকলেই সেটা সম্পূর্ণভাবে বাসের যোগ্য হয়ে যায় না, প্রয়োজন আছে আরো কিছু উপাদানের যেমন, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস বা আগুনের ব্যবস্থা (রান্নার জন্য), পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ইত্যাদি। এই উপাদানগুলিকে আমরা সামাজিক উপাদানগুলির সাথে তুলনা করতে পারি।
বাড়ীর কাঠামো এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধা থাকলে বাড়ীটিকে আবাসযোগ্য করা সম্ভব, তবে এই বাড়ীটিকে আরো আরামদায়ক ও সুষ্ঠুভাবে বাসের উপযোগী করার জন্য আরও কিছু উপাদান জরুরী, যেমন: বাড়ীটিতে আলো-বাতাস প্রবেশের জন্য প্রয়োজন জানালা, দরজা, আরামদায়ক পরিবেশ তৈরীর জন্য বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতি। এগুলোকে তুলনা করা যেতে পারে মানসিক উপাদানের সাথে।
অর্থাৎ আমরা দেখতে পেলাম যে একটি বাড়ীকে আবাসযোগ্য, আরামদায়ক ও সুষ্ঠুভাবে গড়ে তোলার জন্য যেমন বিভিন্ন ধরনের উপাদান ও এর সুষ্ঠু সমন্বয়ের প্রয়োজন তেমনি ব্যক্তির সার্বিক ও সুষ্ঠু উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন মনোসামাজিক ও শারীরিক উপাদানগুলির সমন্বিত অবস্থান।
মানসিকভাবে সুস্থ ব্যক্তি মানসিক ভাবে অসুস্থ ব্যক্তির তুলনায় পরিস্থিতির প্রতি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া করে থাকে। মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিরা জীবনের সবকিছুর প্রতিই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া করে থাকে। তাই অপ্রকৃতিস্থ/অবাস্তব চিন্তা-ভাবনা দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতীক হতে পারে। কিছু বিশেষ বিষয় প্রমাণ করে একজন ব্যক্তি মানসিকভাবে কতটা সুস্থ। এগুলো হচ্ছে নিম্নরূপঃ
১। নিজের সম্পর্কে ভালো বোধ করা।
। অন্যদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের সময় সহজ বোধ করা।
৩। দুঃশ্চিন্তা ও তাড়না নিয়ন্ত্রণ করতে পারা।
৪। ইতিবাচক চিন্তাধারা পোষণ করা।
৫। অল্পে তুষ্ট থাকা ।
৬। লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হওয়া।
৭। প্রকৃতিকে গুরুত্ব দেয়া ও উপভোগ করতে পারা।
যে কোন তীব্র শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতা কিংবা কোন সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ- বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা দুর্ঘটনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে মানুষ বিভিন্ন রকমের প্রতিক্রিয়া করে থাকে। এই প্রতিক্রিয়ার ধরন শিশু- কিশোর এবং বয়স্ক সবার জীবনযাপন প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। তীব্র দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে ব্যক্তির শারীরিক আঘাতের মাত্রা মৃত্যুঝুঁকি থেকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে নিয়ে যেতে পারে। ব্যক্তির নিজের বা অন্যের শারীরিক আঘাত বা অন্যের মৃত্যু মনে ভীতির সঞ্চার করে। একই সাথে স্বাভাবিক কাজ কর্মে ব্যাঘাত ঘটার ফলে আর্থিক অনটন চরমে পৌঁছে।
(অসমাপ্ত)